ভোলার উন্নয়ন শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি নয়, বরং কার্যকর পরিকল্পনা ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দ্বীপ জেলাটিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপে এ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন রাজনৈতিক নেতারা। গতকাল কোস্ট সেন্টার, ভোলা কার্যালয়ে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোলার উন্নয়নে আমাদের ভাবনা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ আয়োজিত হয়। সংলাপে বক্তারা জানান।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশন ও বণিক বার্তার যৌথ আয়োজিত এ জাতীয় সংলাপ সঞ্চালনা করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক প্রশাসন মোস্তফা কামাল আকন্দ। সংলাপে অংশ নেন স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী, রাজনৈতিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী ও এনজিও প্রতিনিধিরা।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, ‘ভোলার চরফ্যাশন থেকে কোস্ট ফাউন্ডেশনের জন্ম। শিকড়ের সেই টান থেকেই আমরা চাই, ভোলার ভাবনাগুলো নির্বাচনী প্রার্থীদের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে পৌঁছে যাক এবং এটি অন্য নির্বাচনী এলাকার জন্য মডেল হয়ে উঠুক।’
দ্বীপবাসীর প্রধান দাবি হিসেবে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে স্থায়ী সেতু নির্মাণের উল্লেখ করেন মোস্তফা কামাল আকন্দ। ইলিশ রক্ষা ও উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়নের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
ভোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল উল্লেখ করে কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘ভোলা থেকে দেশের মোট ইলিশের প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ হয়ে থাকে। জাটকা নিধন বন্ধ করলে ইলিশের বাজারমূল্য কয়েক মাসে ৫০০ থেকে দুই-তিন হাজার টাকায় পৌঁছানো সম্ভব, যা জেলে ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্য লাভজনক।’
ভোলা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষ চরম দরিদ্রতার মধ্যেও জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা চায়। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিক্ষার উন্নয়ন ও মাদক নিয়ন্ত্রণ।’
নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে ভোলা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভোলায় কোনো বড় ধরনের নির্বাচনী হুমকি নেই। নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ।’
‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের লোভ না থাকলে চরগুলোর দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব’ উল্লেখ করে জেলা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম বাসেত বলেন, ‘শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রান্তিক বাস্তবতা হলো, ছেলেদের অনেকেই মাদক সেবন ও শিশুশ্রমে জড়িত, মেয়েরা শিক্ষায় পিছিয়ে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘চরাঞ্চল মাছের প্রাকৃতিক ব্রিডিং গ্রাউন্ড। অবৈধ জাল ব্যবহারে প্রায় ৯০ শতাংশ মাছ ধ্বংস হয়। জেলেদের কার্ড ও বরাদ্দ সঠিকভাবে বিতরণ করা জরুরি, যাতে প্রকৃত জেলেরা লাভবান হয়।’
জেলার সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা সুফল রায় বলেন, ‘ভোলায় বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী, ইকোপার্ক ও ম্যানগ্রোভ বাগান সংরক্ষণে জনবল সীমিত। ভূমিতে যত্রতত্র মহিষ চরার কারণে বনাঞ্চলের ক্ষতি হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন।’
ভোলার প্রধান সমস্যা কর্মসংস্থান ও গ্যাস থাকলেও শিল্প-কারখানা নেই বলে জানান ভোলা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো. হাফিজ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘গ্যাসভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ, ইপিজেড স্থাপন এবং ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ ভোলার উন্নয়নের চাবিকাঠি।’
ভোলা-১ আসনের জাতীয় পার্টি প্রার্থী আকবর হোসেন নয়ন বলেন, ‘আমি যদি নির্বাচিত হই তাহলে দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং স্থানীয়ভাবে মামলাজট মীমাংসা অগ্রাধিকার পাবে।’ একই আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী ওবায়েদুর রহমানের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে গুরুত্ব পেয়েছে ভোলার জ্বালানি তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ রক্ষা, নদীভাঙন রোধ, সুষ্ঠু বরাদ্দ ও গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন।
ভোলা-৩ আসনের গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী আবু তৈয়ব বলেন, ‘নির্বাচিত হলে তারুণ্য নির্ভর ভোলা গড়তে চাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ভোলাবাসীর প্রাণের দাবি।’ একই আসনের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির প্রার্থী নিজামুল হক বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচিত হলে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে কাজ করবেন, এমনটাই প্রত্যাশা করছি।’ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচিত হলে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করব। চট্টগ্রাম-ভোলা ফেরিঘাটে সন্ত্রাস রোধে অবদান রাখতে চাই।’
ভোলা-২ আসনের জাতীয় পার্টি প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম রিন্টু বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও প্রার্থীদের সহনশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচিত হলে পর্যটন, কারিগরি শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ভোলাবাসীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করব।’
প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে উল্লেখ করে সংলাপের শেষ পর্যায়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত না হলেও মানুষের উন্নয়নে কাজ করা সম্ভব। সমস্যা সমাধানে যৌক্তিক প্রতিশ্রুতি দিন।’
Recent Comments